শাহ্ আলম খান ॥ ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সতেরো বছর ডিপিএস হিসেব পরিচালনাকারী কুমারচন্দ্র বিশ্বাসের টাকা ফেরত নিয়ে তুলকালাম কা- ঘটে মাগুরার শালিখা থানার বুনাগাতি শাখায়। জমাকৃত প্রায় পৌনে চার লাখ টাকার সঙ্গে মুনাফা না দিয়ে উল্টো এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা কেটে রাখার শর্ত বেঁধে দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে মৃত চন্দ্র বিশ্বাসের নমিনিকে সমুদয় পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হয়।’
এ ধরনের গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ প্রতিনিয়তই জমা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের হিসেবে গত এক বছরে প্রায় ২২শ’ গ্রাহকের অভিযোগ জমা পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উর্ধতন এক কর্মকর্তার মতে, বেশিরভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গ্রাহক হয়রানি কমছে না। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত দুই হাজার অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছেÑ যার সব রায়ই গ্রাহকের পক্ষে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই উর্ধতন কর্মকর্তা মনে করেন, ‘ব্যাংকগুলোর উচিত তার সকল গ্রাহকের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং তাদের সেবার মান আরও বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রাহক ধরে রাখা। ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে মনোপলি আচরণের কোন সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, টিকে থাকতে হলে উন্নত সেবা প্রদানের মাধ্যমেই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এজন্য সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপকদের এ ধরনের ঘটনা এড়াতে আরও তৎপর হওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর হস্তক্ষেপের কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, জনগুরুত্ব বিবেচনায় এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গেই দৈনন্দিন কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শাখা ব্যাংকের কর্মকা- কঠোর নজরদারিতে রাখারও পরামর্শ দিয়ে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানা গেছে, গত এক বছরে সারাদেশ থেকে প্রায় ২ হাজার ১শ’ ৫১টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এতে বহুল আলোচিত ডেসটিনি গ্রুপের প্রতারণাসহ শতাধিক বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা ধরনের অনিয়ম, হয়রানি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনৈতিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়েই বিভিন্ন সময় গ্রাহক এসব অভিযোগ লিখিত আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টিতে আনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে’র (সিআইপিসি) একটি সূত্র জানায়, সব ক’টি অভিযোগই বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত পর্যাপ্ত যাচাইবাছাইয়ের উদ্যোগ নিয়ে থাকে। গত এক বছরের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে সূত্রটি আরও জানায়, এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার ৯শ’ ৪১টি অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে সন্তোষজনক নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ২১০টি অভিযোগের সুরাহা করতে এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, খুব শীঘ্রই এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
সূত্রটির মতে, মাঝেমধ্যে শাখা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকের কাছ থেকে আঁতকে ওঠার মতো অভিযোগ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইপিসি শাখা চেষ্টা করে এসব অভিযোগের সন্তোষজনক নিষ্পত্তি করতে। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত শাখা ব্যাংকের অনৈতিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে এমনই একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছেন মাগুরার রাকেশ বিশ্বাস। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মাগুরা জেলার শালিখা থানার বুনাগাতি শাখার ওই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে অভিযোগকারীর পিতা কুমারচন্দ্র বিশ্বাস ১৯৯৪ সালে ৫শ’ টাকার মাসিক কিস্তিতে ২০ বছর মেয়াদী একটি ডিপিএস খোলেন এবং অভিযোগকারীকে (রাকেশ বিশ্বাস) নমিনি হিসেবে মনোনীত করেন। কিন্তু কুমারচন্দ্র বিশ্বাস ডিপিএসটি ১৭ বছর পরিচালনা করার পর ২০১১ সালের এপ্রিলে দুরারোগ্য ক্যান্সারে মারা যান। আর অনিয়মটি ঘটে এখানেই।
পিতার নমিনি হিসেবে রাকেশ বিশ্বাস ব্যাংকের কাছে ডিপিএসের অর্থ পাওয়ার জন্য আবেদন করলে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়নি বলে জমাকৃত টাকার ওপর সরল সুদ হিসেব করে তাকে মাত্র ২ লাখ ৩২ হাজার ৬শ’ ৮৭ টাকা দেয়ার প্রস্তাব দেয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাটি। অথচ ওই ১৭ বছরে (৩০ এপ্রিল, ২০১১ পর্যন্ত) মৃত কুমারচন্দ্র বিশ্বাসের পাস বইয়ে ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৬১ টাকা স্থিতি জমা হয়। এ অবস্থায় অভিযোগকারী প্রস্তাবকৃত টাকা গ্রহণ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে গত ২৯/০৬/২০১১ তারিখে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওই শাখার ব্যবস্থাপক ও তাদের প্রধান কার্যালয়ের অভিযোগ কেন্দ্রকে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি দ্রুত ও সুষ্ঠু সুরাহা করার নির্দেশ দেয়া হয়। জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ ধরনের হস্তক্ষেপ করায় ব্যাংক শাখাটি গত ২০/০৭/২০১১ তারিখে ডিপিএসের পুঞ্জীভূত সুদসহ ডিপিএসের অর্থ বাবদ মোট ৪ লাখ ৪ হাজার ৭০ টাকা হিসেবটির নমিনি ও অভিযোগকারী রাকেশ বিশ্বাসকে প্রদান করতে বাধ্য হয়। এ ধরনের আরও একটি গুরুতর অভিযোগ মিলেছে খোদ রাজধানীতেই বেসরকারী একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। আর এ অভিযোগটি করেছেন এসএমই কনসালট্যান্ট লিমিটেড ঢাকার চেয়ারম্যান জাহেদুর রহমান। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, একটি বেসরকারী ব্যাংকের রাজধানীর মতিঝিল শাখায় এসএমই কনসালট্যান্ট লিমিটেডের হিসেবে কনসালটেন্সি ফি বাবদ ১৮০ ডলারের বৈদেশিক রেমিটেন্স আসে। রেমিটেন্সর ওই টাকা অভিযোগকারীর হিসেবে জমা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সকল তথ্য-উপাত্ত ও দলিলাদি জমা দেন। কিন্তু অভিযোগকারীর হিসেবে ওই অর্থ জমা হয় না। বরং ওই ব্যাংক শাখাটির পক্ষ থেকে অভিযোগকারীকে তার ব্যাংক হিসেবের বিদ্যমান ব্যালেন্স থেকে ১৫ লাখ টাকার এফডিআর করার জন্য চাপ দেয়া হয়। বলা হয়, এফডিআর না করলে বাইরে থেকে আসা ওই রেমিটেন্স তাঁর হিসেবে জমা করা হবে না।
উপায়ান্তর না দেখে অভিযোগকারী জাহেদুর রহমান বাংলদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের (সিআইপিসি) শরণাপন্ন হন। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকটির অভিযোগ সেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে রেমিটেন্স বাবদ আসা ওই পরিমাণ অর্থ দ্রুত অভিযোগকারীর হিসেবে জমা করার নির্দেশ দিলে ওই দিনই ব্যাংকটি প্রাপ্য অর্থ অভিযোগকারীর হিসেবে জমা করে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করে।
উল্লেখ্য, সরকারী-বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কোন অনৈতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে যাতে গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য বিগত ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বর্তমান গবর্নর ড. আতিউর রহমান প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পৃথক শাখা ‘গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র’ (সিআইপিসি) চালু করেন।
129, Shenpara Parbata, Mirpur-10, Dhaka-1216, Bangladesh. Phone: 88029007039 Cell: 8801711584519 E-mail: editor@topbdnews.com
Comments
RSS feed for comments to this post